বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্তির বিকল্প নেই : ডিএসই চেয়ারম্যান

পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে বহুজাতিক কোম্পানি দ্রুত তালিকাভুক্ত করার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হাফিজ মুহম্মদ হাসান বাবু। 

তিনি বলেন, বাজারের গভীরতা অর্জনে ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন স্থানীয় ও বহুজাতিক কোম্পানি দ্রুত তালিকাভুক্ত করণের কোনো বিকল্প নেই। আর এ বিষয়ে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে অবদান রাখতে হবে। এ কাজগুলো করতে পারলে পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে। পুঁজিবাজারের সেতুবন্ধন হিসেবে আপনারা বাজারে বিনিয়োগকারী ও কোম্পানিগুলোকে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে প্রত্যাশিত পুঁজিবাজার গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন।

সোমবার (২১ আগস্ট) ‘মার্চেন্ট ব্যাংকারদের সাথে তালিকাভুক্তি সংক্রান্ত সমন্বয় সভায়’ তিনি এসব তথা বলেন। সভাটি ডিএসই আয়োজন করে। ডিএসই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) এম. সাইফুর রহমান মজুমদারে সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) প্রেসিডেন্ট ছায়েদুর রহমান।

এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ডিএসই’র প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা খায়রুল বাশার আবু তাহের মোহাম্মদ এবং মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ডিভিশনের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ছামিউল ইসলাম, লংকা বাংলা ইনভেস্টমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইফতেখার আলম, আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের সিইও ও জেনারেল ম্যানেজার মাজেদা খাতুন, আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক(এমডি) রেজা উদ্দিন আহমেদ এবং এএএ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের পরিচালক মোহাম্মদ ওবায়দুর রহমান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডিএসই’র চেয়ারম্যান বলেন, এশিয়ার অন্যান্য স্টক এক্সচেঞ্জের তুলনায় বাংলাদেশে মার্চেন্ট ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি থাকা সত্ত্বেও গত কয়েকবছর ধরে পুঁজিবাজারে ভালো মানের আইপিও তালিকাভুক্তি হয় নাই। বর্তমানে বাংলাদেশে ৬৮টি মার্চেন্ট ব্যাংক কাজ করছে। কিন্তু নতুন আইপিও আনার অনুপাত অন্যান্য দেশের তুলনায় খুবই কম। ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে ২১৬টি মার্চেন্ট ব্যাংক আছে এবং সেখানে ২২১৩টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত। পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জে ১৩টি  মার্চেন্ট ব্যাংক ৫২৪টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত করেছে। বোরসা মালয়েশিয়ার ও কলম্বো স্টক এক্সচেঞ্জে ইস্যু ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি অনুযায়ী গড় তালিকাভুক্ত কোম্পানি যথাক্রমে ২৪ এবং ১২টি৷ ডিএসই গড় মাত্র ৫টি। আরও অধিক আইপিও আনতে আমাদের যৌথভাবে কাজ করতে হবে এবং ইস্যু ম্যানেজারদের সক্রিয় হতে হবে। এ বিষয়ে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা ডিএসই করবে এবং সুন্দর আগামীর পুঁজিবাজার গঠনে আমরা একসাথে কাজ করব।

প্রাইভেট বন্ড সম্পর্কে ড. হাসান বাবু বলেন, ১৬ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা মূল্যের ৪২টি প্রাইভেট বন্ড এটিবি প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ছোট পুঁজির প্রয়োজনে এসএমই প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদেরকে কীভাবে পুঁজিবাজারমুখী করা যায় এবং কীভাবে পরামর্শ সেবা দেওয়া যায় সেটা নিয়ে আমরা যৌথভাবে কাজ করতে চাই।

কোম্পানি তালিকাভুক্তির প্রতিবন্ধকতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের অনেক বাধা রয়েছে যেমন-উদ্যোক্তাদের মানসিকতা, আমলাতন্ত্র, সঠিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া, আইপিওর দীর্ঘসূত্রতা, বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষেত্রে মূল দেশ থেকে তহবিল প্রাপ্তি, রাজস্ব গোপন করার প্রবণতা, নীতির অসামঞ্জস্যতা, কর বৈষম্য, ব্যাংক এবং নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহজে ঋণ ইত্যাদি। আজকের বৈঠকের মাধ্যমে আমাদের মূল প্রতিবন্ধকতাসমূহ উঠে আসবে এবং সে অনুযায়ী আমরা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করব।

‌‘এছাড়াও অঞ্চলভিত্তিক রোড শো আয়োজনের মাধ্যমে উদ্যোক্তাগণকে তাদের ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্ত করতে উৎসাহিত করব। এক্ষেত্রে একটি নতুন কর্ম কৌশল নিয়ে কাজ করতে এঅআইডি, বিবি, বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ, বিএমবিএ, আইসিএবি এবং এফআরসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে।’

চেয়ারম্যান বলেন, পুঁজিবাজারের সমস্যা একদিন আলোচনা বা সেমিনার করে সমাধান করা সম্ভব নয়। নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর অনেকগুলো বিষয়কে দেখতে হয়। এ অবস্থায় আমাদের একটি মাল্টিডাইমেনশন বডি তৈরি করা উচিত, যারা বাজারের সঠিক পর্যালোচনার মাধ্যমে কীভাবে মার্কেটকে উঠানো যায় সেই দিক নির্দেশনা তৈরি করবে, যেটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা দিতে পারব।

পরে কোম্পানির তালিকাভুক্তি ও মার্চেন্ট ব্যাংকের কার্যক্রমের বর্তমান পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বাজারের প্রত্যাশা, ভালো মানের আইপিও আনার সুযোগ এবং বাধা, মূল মার্কেট, এমএমই মার্কেট এবং এটিবি মার্কেটের সম্ভাবনা, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং পারস্পরিক সহযোগিতা, সচেতনতা প্রোগ্রাম ও পুঁজিবাজারে বিস্তৃতি পেতে উদ্যোক্তাসহ কোম্পানির সিইও এবং সিওওদের আকৃষ্ট করা, যৌথ প্রচারণা বা মেলা, পুঁজিবাজারকে উৎসাহিত করতে সরকারকে অবহিত করা এবং চাহিদা ও যোগান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ দ্বারা সেক্টর ভিত্তিক কাজসহ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর আলোচনা করা হয়।

বিএমবিএর প্রেসিডেন্ট ছায়েদুর রহমান বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে যখন প্রস্তাব দেওয়া হয়, তখন কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হলে তাদের লাভ কি সে বিষয়ে জানতে চায়। কিন্তু মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো তাদেরকে লাভের বিষয়ে বলতে পারে না। কারণ মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোই জানে না যে তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানিগুলোর কি লাভ হবে। বাজারে তালিকাভুক্তি ও বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে অনেকবার কথা হয়েছে এবং তাদেরকে বেশ কিছু বিষয় বুঝানো হয়েছে। দীর্ঘদিন বুঝানোর ফলে বিএসইসি অনেক কিছু আমলে নিলেও এনবিআর এখনো কোনো বিষয় আমলে নেয়নি।

ফলে তালিকাভুক্ত হলে কোনো লাভ হবেনা দেখে কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হচ্ছে না বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, বর্তমানে কোম্পানিগুলো ব্যাংক নির্ভরতা। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে কোম্পানির এক দেড় বছর সময় লাগে। কিন্তু ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে সময় লাগে দুই থেকে তিন মাস। সেক্ষেত্রে সরকারের পলিসি থেকে উদ্বুদ্ধ করানো না যায়, তাহলে তালিকাভুক্ত বাড়ানো যাবে না। সরকারি হিসেবে কোম্পানি আছে ২ লাখের বেশি, যার মার্কেটে আছে ৩৫০ টি কোম্পানি যা ২ শতাংশের কম। কারণ তাদের তালিকাভুক্ত হওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তিন বছরের মধ্যে তালিকাভুক্ত হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায়, সময় বেশি লাগলেও বর্তমানে পুঁজিবাজারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বেশি বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, মার্চেন্ট ব্যাংকের অবস্থার উন্নয়ন করতে পারলে আইপিও বাড়বে। তারা ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে বাধাগ্রস্ত হয়। তাদেরকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো কর দিতে হচ্ছে। কিন্তু তারা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুযোগ সুবিধা পায় না এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হয় না।

এসময় তিনি তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হারের ব্যবধান বাড়ানোর বিষয়টি এনবিআরকে আবারো বিবেচনা করার আহ্বান জানান।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

আজকের দিন-তারিখ
  • শুক্রবার (ভোর ৫:২০)
  • ১৯শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
  • ১৩ই মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি
  • ৪ঠা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল)
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Raytahost.com