কম দরে পাঠ্যবই মুদ্রণ ছাপা ও কাগজের মানে ছাড় নয়

সরকার ২০১০ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে সব শিক্ষার্থীকে বিনা মূল্যে নতুন পাঠ্যবই দিয়ে আসছে। দেশের ভেতরে তো বটেই, বহির্বিশ্বেও সরকারের এই উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে বইয়ের মান নিয়ে। অনেক সময় ছাপা ও কাগজের মান এতটা খারাপ হয় যে কিছুদিন পর আর পাঠোপযোগী থাকে না।

শিক্ষার্থীরা বিপত্তিতে পড়ে। গত বছর সময়মতো কার্যাদেশ না দেওয়ায় বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের কাছে সব বই পৌঁছানো যায়নি। কোনো কোনো বই পৌঁছাতে মার্চ পর্যন্ত লেগেছে। ধারণা করি, এই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবারে ছাপার কাজটি আগেভাগে শুরু করেছে; যদিও হাতে সময় আছে পাঁচ মাসের মতো।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মাধ্যমিক স্তরে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে অস্বাভাবিক কম দরেই ছাপার কাজ নিচ্ছেন মুদ্রণকারীরা। অন্যদিকে গত বছরের চেয়ে এবারে ছাপার কাগজের উজ্জ্বলতার শর্ত ৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত বছর এটি ছিল ৮৫ শতাংশ। এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলেছেন, কাগজ–সংকটের কথা মাথায় রেখেই এটা করা হয়েছে।

ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে এনসিটিবি প্রাক্কলিত ব্যয় গড়ে ফর্মাপ্রতি তিন টাকা ধরেছিল। কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণিতে মুদ্রণকারীরা ফর্মাপ্রতি সর্বনিম্ন দর দিয়েছে ১ টাকা ৯৩ পয়সা। আর সপ্তম শ্রেণিতে দেওয়া হয়েছে ১ টাকা ৭৯ পয়সা। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে মোট বই ছাপা হবে যথাক্রমে প্রায় ৬ কোটি ৪৫ লাখ ও ৪ কোটি ৪৫ লাখ।

উল্লেখ করা দরকার যে একশ্রেণির মুদ্রণকারী প্রতিবছরই পাঠ্যবই ছাপা নিয়ে সমস্যা তৈরি করেন। প্রথমে তঁারা নিম্ন দরে কার্যাদেশ নেন। পরে নানা অজুহাত তুলে সময়মতো বই পৌঁছান না। আবার যে বই পৌঁছানো হয়, তার ছাপা ও কাগজের মান থাকে অত্যন্ত খারাপ। এনসিটিবির কর্মকর্তারাই বলেছেন, শর্ত শিথিল করে কিংবা নিম্ন দরপত্রে কার্যাদেশ দিলে সরকারের কিছুটা সাশ্রয় হলেও ছাপার মান রক্ষা করা যাবে না।

এনসিটিবির প্রাক্কলিত ব্যয় যৌক্তিক হলে মুদ্রণকারীদের দেওয়া নিম্নতর দর অযৌক্তিক। আবার মুদ্রণকারীদের দেওয়া দর যৌক্তিক হলে এনসিটিবির প্রাক্কলিত ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। বিষয়টি এনসিটিব নয়, বাইরের মুদ্রণ বিশেষজ্ঞদের দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। নিম্নতর দরে কার্যাদেশ দিয়ে নিম্নমানের বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানো হবে, তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। পাঠ্যবই মুদ্রণের ক্ষেত্রে একটি সিন্ডিকেট বা কায়েমি স্বার্থবাদী চক্র গড় উঠেছে।

আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো, যে সংখ্যক শিক্ষার্থীর নামে বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপা হয়, প্রকৃত পক্ষে সে সংখ্যক শিক্ষার্থী আছে কি না। মাধ্যমিকে ১ কোটি ৬৭ লাখ শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় বই ছাপা হচ্ছে। কিন্তু মাধ্যমিক স্কুল ও মাদ্রাসা মিলে প্রকৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম হবে। বেশি বই ছাপার পক্ষে পরবর্তী শিক্ষা বছরে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার যুক্তি দেখানো হয়। কিন্তু সেই সংখ্যা ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি হতে পারে না।

এনসিটিবির কর্মকর্তা কিংবা মুদ্রণকারী চক্র—যারাই নিম্নমানের বই ছাপার জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। দরপত্র অনুমোদনের আগে তাদের যোগ্যতা, দক্ষতা যথাযথভাবে যাচাই করে দেখতে হবে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে যাতে নিম্নমানের বই না পৌঁছায়, সে বিষয়ে এনসিটিবিকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।

সূত্র: প্রথম আলো

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

আজকের দিন-তারিখ
  • মঙ্গলবার (বিকাল ৩:৪২)
  • ২৩শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
  • ১৭ই মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি
  • ৮ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল)
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Raytahost.com