প্রবেশপত্র তুলতে গিয়ে জানতে পারলো তারা কলেজের শিক্ষার্থীই না

যাবতীয় ফি দিয়ে ভর্তি হয়েছেন। নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা সব কিছুতেই অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষার দিন জানতে পারেন তারা শিক্ষার্থী নন। এমন ভর্তি প্রক্রিয়ায় প্রতারণার শিকার হয়েছেন চার শিক্ষার্থী। এমনই এক ঘটনা ঘটেছে বগুড়া সরকারি শাহ সুলতান কলেজে।

বৃহস্পতিবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে প্রতারণার শিকার চার শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে এসব জানা যায়। এসব শিক্ষার্থীর দাবি, এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন অন্তত ১৫ শিক্ষার্থী। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীর ভুয়া ভর্তির ঘটনা স্বীকার করলেও তাদের সঠিক সংখ্যা বলতে পারেনি।

শিক্ষার্থীরা হলেন, রাশেদুল ইসলাম, শারমিন আক্তার, হাবিবা আক্তার ও মো. মিলন। এমন ঘটনায় অভিযুক্ত অফিস সহকারীর নাম হারুনুর রশিদ। তিনি মাস্টাররোলে কলেজে কর্মরত এবং কলেজের পরীক্ষা কার্যক্রম কমিটির সদস্য। তিনি ছাড়াও এই প্রতারণার কর্মকাণ্ডে আমিনুল ইসলাম, আব্দুল হান্নান নামে আরও দুই সহকারী জড়িত।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বগুড়া সদরের সাবগ্রাম এলাকার রাশেদুল ইসলাম বলেন, তিনি এসএসসি পরীক্ষায় পাশের পর সরকারি শাহ সুলতান কলেজে মানবিক শাখায় ভর্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করেন। তবে ভর্তি প্রক্রিয়ার নিয়ম অনুসারে তার সিরিয়াল আসে করোনেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। কিন্তু তিনি ভর্তির বিষয়ে জানতে শাহ সুলতান কলেজের অফিসে যোগাযোগ করেন। ওই সময় তার কথা হয় অফিস সহকারী হারুনুর রশিদের সঙ্গে। তিনি দাবি করেন অফলাইন পদ্ধতিতেও ভর্তি হওয়া যাবে। তার কথামতো ৬ হাজার টাকা দেন রাশেদুল ইসলাম। এই ফি পরিশোধের রশিদও তাকে দেওয়া হয়। ভর্তির পর তার শ্রেণি রোল দেয়া হয় ১৫৭৫। এরপর রাশেদুল নিয়মিত ক্লাস করেন। অংশ নিয়েছেন প্রাক নির্বাচনী ও নির্বাচনী পরীক্ষায়।

রাশেদুল ইসলাম আরও বলেন, আমাদের ভর্তির সময় টাকা নিয়েছে। এরপর কলেজের শোল্ডার ব্যাজ, পরীক্ষার জন্য টাকা নিয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষার জন্য ৬ হাজার টাকা দিয়ে ফরম ফিলাপও করেছি। অথচ প্রবেশপত্র নিতে এসে দেখি আমরা শিক্ষার্থী না। অন্য শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও একই রকম অবস্থা। হারুনুর রশিদ তাদের সবার কাছে থেকে ভর্তির নামে টাকা নিয়েছেন।

প্রতারণার শিকার অপর শিক্ষার্থী শারমিন আক্তার বলেন, আমরা তো কলেজের নিয়ম অনুসারে সব করেছি। ভর্তির পর আমরা একাধিক বার হারুনের কাছে কাগজপত্র চেয়েছি। তিনি বলেছেন, তোমরা তো ভর্তি হয়েছো। ক্লাস করো, কাগজ দিয়ে কি করবা।  একেবারে এইচএসসি পরীক্ষার পর নিও।

শিক্ষার্থী হাবিবা আক্তারের মা হাসিনা বানু আক্ষেপ করে বলেন, কলেজের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি ভর্তির নামে প্রতারণা করেন, তাহলে বাচ্চারা কীভাবে বুঝবে? আর আমারসহ এতগুলো মানুষের সন্তানের দুই বছর জীবন থেকে নষ্ট হয়ে গেল তার কী হবে? এর বিচার কে করবে?

কলেজ শিক্ষার্থীদের দাবি, কলেজ স্টাফদের একটি সিন্ডিকেট গোপনে এসব প্রতারণার কাজ করে বেড়াচ্ছে। হারুন ছাড়া এই সিন্ডিকেটে অফিসের বড় বাবু তাজমিলুরসহ একাধিক ব্যক্তি জড়িত।

শাহ সুলতান কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, গতকাল বুধবার থেকে আমরা বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী পেয়েছি, যারা পরীক্ষার প্রবেশপত্র নিতে এসে ঘুরে গেছে। কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি তাদের সঙ্গে প্রতারণা হয়েচে। এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা অন্তত ২০ জন হবে।

বিষয়টি অস্বীকার করে হারুনুর রশিদ বলেন, আমি কারও কাছে টাকা নেইনি। টাকা আমিনুলরা নিতে পারে। এ বিষয়ে আপনারা বড় বাবুর সঙ্গে কথা বলেন।

তবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য আমিনুল ইসলামের খোঁজ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। অপর অফিস সহকারী আব্দুল হান্নান বলেন, আমি শুধু একজনের কাছে ৮ হাজার টাকা নিয়েছিলাম। সেটাও হারুনকে দিয়েছি কাজ করার জন্য। এটা আমার ভুল হয়ে গেছে।

কলেজের প্রধান সহকারী (বড়বাবু) তাজমিলুর রহমান বলেন, আমি এসবের সঙ্গে জড়িত না। এসব টাকা নেওয়ার কাজ হারুনরা করেছে। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখেন যারা টাকা দিছে তাদের কাছে কোনো মূল রশিদ নেই। আমার ক্যাশ মিলিয়ে দেখেন কোনো অনিয়ম পাবেন না।

শাহ সুলতান কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক মোহাম্মদ আইয়ুব আলী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ওই শিক্ষার্থীরা দুই বছরে কখনও কোনো শিক্ষকের কাছে আসেনি। তাহলে হয়তো এই অবস্থায় পড়া লাগতো না। এর আগে অনৈতিক কাজে বরখাস্ত হয়েছিল হারুন। ওই সময় তিনি এমন অপরাধ আর করবেন না এ মর্মে ক্ষমা চান।

সরকারি শাহ সুলতান কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক রেজাউন নবী বলেন, মোট কতজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে এমন ঘটনা তা বলতে পারি না। তবে তারা লিখিত অভিযোগ দিলে একটা তদন্ত কমিটি গঠন করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর এই শিক্ষার্থীদের বিষয়ে বোর্ডে যোগাযোগ করা হবে। এবার হয়তো আর কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। কিন্তু আগামীতে যাতে পরীক্ষা দিতে পারে সেই ব্যবস্থা করা হবে।

এ বিষয়ে রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. কামরুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, গতকাল বুধবার রাতে জানতে পারলেও তাদের অনন্ত পরীক্ষায় বসার ব্যবস্থা করা যেত। আমরা বিষয়টি দেখবো।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

আজকের দিন-তারিখ
  • বুধবার (বিকাল ৩:৪৩)
  • ১৭ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
  • ৮ই শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি
  • ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ (গ্রীষ্মকাল)
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Raytahost.com