আসন্ন নির্বাচন ও সহিংসতা

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনাইয়া আসিতেছে, ততই নির্বাচনি মাঠে উত্তাপ ছড়াইতেছে। কোথাও কোথাও সংঘাত ও সহিংসতা বাড়িয়া গিয়াছে। ইহাতে ঘটিতেছে হতাহতের ঘটনাও। প্রার্থীর ওপরও হামলা করা হইতেছে বা হুমকি-ধমকি দেওয়া হইতেছে। অনেক প্রার্থী বা সমর্থকের কথাবার্তা ও আচার-আচরণ সুবিধাজনক নহে। নির্বাচনি প্রচারণার মাঠে ‘তোমার ঘাড় মটকে দেব। তুমি এখনো লোক চিনো নাই’—এমন কথা যেমন বলা হইতেছে, তেমনি বলা হইতেছে—‘নৌকার বাইরে গিয়ে কেউ গলা উঁচু করে কথা বললে, সেই গলা নামিয়ে দেওয়ার কৌশল আমরা জানি’। যাহারা এইভাবে অন্য প্রার্থীকে হুমকি দিতেছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাহারা ক্ষমতাসীনদের স্বঘোষিত সমর্থকও বটে।

যাহারা এমন আচরণ করিতেছেন, তাহাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাহারা স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে একটি স্পর্শকাতর বিভাগের লোকদের প্রভাবিত করিয়া চলিয়াছেন। প্রতিটি জেলা-উপজেলায় নির্বাচন কমিশনের অফিস রহিয়াছে। তাহারা কি জানেন না নির্বাচনের মাঠে এই সকল কী হইতেছে? এদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া প্রকাশ্যেই অবৈধ অর্থের ছড়াছড়ি লক্ষ করা যাইতেছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী একটি আসনে সর্বোচ্চ ২৫ লক্ষ টাকা ব্যয় করা যায়। তাহা হইলে দুর্নীতি দমন কমিশন কী করিতেছে? তাহাদের এত সম্পদের উত্সই-বা কী?

গণতান্ত্রিক দেশে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহা সুন্দর ও সার্থক করিতে ভোটারদের দায়িত্বশীলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে ভোট যে একটি পবিত্র আমানত, তাহা রক্ষায় ভোটারদের সচেতনতার যথেষ্ট অভাব রহিয়াছে। তাহারা সামান্য অর্থের বিনিময়ে প্রভাবিত হন কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে নিজেদের অধিকার প্রয়োগের ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় হইয়া যান। স্বাধীনতা লাভের পর দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এক জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়া আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়ার পূর্বে বলিয়াছিলেন যে, খোদা যেন সেই দেশটাকে হেফাজত করেন। তাই শুধু বড় বড় কথা নহে, ইসি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনকে তৃণমূল পর্যায়েও আচরণবিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে।

আমরা পূর্বেই বলিয়াছি যে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটিয়াছে। অনেক ক্ষেত্রে আজ তাহারা বিভিন্ন দলের গুরুত্বপূর্ণ পদপদবি দখল করিয়া বসিয়া রহিয়াছেন, অথচ তাহারা আসলে সেই মতাদর্শের লোক নহেন। নির্বাচনের মাঠেও তাহার প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে। যদি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সঠিক ও নির্লোভভাবে তাহাদের দায়িত্ব পালন করিত, তাহা হইলে রাজনীতির ক্ষেত্রে আজ তাহারা বিষফোড়া হিসাবে দেখা দিত না। যাহারা আপত্তিকর ভাষায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সম্পর্কে বক্তব্য রাখিতেছেন, তাহা শুধু নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনই নহে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাহা আইন পরিপন্থিও বটে। হয় এই সকল অপপ্রচার, অশ্রাব্য গালাগালি ও মাত্রাতিরিক্ত অপ্রীতিকর ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করিতে হইবে, নতুবা ইহার পরিণতি কী হইবে তাহা ভুলিয়া গেলে চলিবে না। তাহাদের বিরুদ্ধে যদি অনতিবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহা হইলে নির্বাচনপূর্ব ও উত্তর পরিস্থিতি কীরূপ দাঁড়াইবে তাহা কল্পনাতীত।

মনে রাখিতে হইবে, দেশটা স্বাধীন হইয়াছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। তাহারা আজ যাহা করিতেছেন, তাহা বন্ধ করিতে আরেকটা স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রয়োজন হইবে। যাহারা এলাকাবাসীকে হুমকি দিতেছেন বা গ্রেফতারের ভয় দেখাইতেছেন, তাহারা জানেন না কত ধানে কত চাউল। তাহাদের এই ঔদ্ধত্যের উত্স কোথায়—এই প্রশ্ন স্বাভাবিক কারণেই জনমনে না উঠিয়া পারে না। আমরা মনে করি, যাহারা তৃণমূল পর্যায়ে নির্বাচন আয়োজন বা পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে রহিয়াছেন, তাহাদের কানেও পানি যাওয়া উচিত। কেবল ঘরে বসিয়া বাংলাদেশকে দেখিলে চলিবে না। মাঠ পর্যায়ে আসিয়া প্রকৃত পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করিয়া দেখিতে হইবে।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

আজকের দিন-তারিখ
  • বৃহস্পতিবার (সকাল ৬:০৩)
  • ২০শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
  • ১৪ই জিলহজ, ১৪৪৫ হিজরি
  • ৬ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল)
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Raytahost.com