নতুন বছরে ইউক্রেনের যুদ্ধের যে তিন পরিণতি হতে পারে

ইউক্রেনে সংঘাত তৃতীয় বছরে গড়াতে যাচ্ছে। গত কয়েক মাসে যুদ্ধক্ষেত্রে খুব সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে। নতুন বছরে অর্থাত্ ২০২৪ সালে এই যুদ্ধ কোন দিকে গড়াবে? আগামী ১২ মাসে এই যুদ্ধকে ঘিরে কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, এ বিষয়ে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন তিন জন সামরিক বিশ্লেষক। তারা তিন পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করেছেন।

যুদ্ধ চলবে, তবে অনির্দিষ্টকালের জন্য নয়

লন্ডনের কিংস কলেজের ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার স্টাডিজের বারবারা জানচেত্তার মতে, ইউক্রেনে যুদ্ধ শিগিগরই থেমে যাবে, এমন সম্ভাবনা এখন আগের চেয়ে দুর্বল। গত বছরের এই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে, ভ্লাদিমির পুতিন এখন আগের চেয়েও শক্তিশালী। শুধু সামরিক শক্তির বিচারেই নয়, রাজনৈতিকভাবেও গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি শক্ত অবস্থানে রয়েছেন তিনি। বারবারা জানচেত্তা বলেন, ইউক্রেনের শীতকালীন অভিযান সম্প্রতি থেমে গেছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। আবার রাশিয়ার দিক থেকেও তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। যুদ্ধের ফল আসলে নির্ভর করছে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শত মাইল দূরের ব্রাসেলস ও ওয়াশিংটনে হওয়া সিদ্ধান্তের ওপর।

পশ্চিমা শক্তিগুলো ২০২২ সালে ইউক্রেনের পক্ষে সমর্থনের যে প্রদর্শন করেছিল, তা ২০২৩ সালে জারি ছিল। কিন্তু তাদের সেই সমর্থন প্রকাশ সম্প্রতি যেন অনেকটাই ম্র্রিয়মাণ হতে শুরু করেছে। ইউক্রেনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার প্যাকেজ কংগ্রেসের অনুমোদন পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক সহায়তা ইউক্রেন পাবে কি না, তা নির্ভর করছে হাঙ্গেরির সমর্থন দেওয়া-না দেওয়ার ওপর।

পশ্চিমা শক্তিগুলোর নিজেদের ভেতরে এই দোটানা পুতিনকে আরো আত্মবিশ্বাসী করেছে। তার সাম্প্রতিক বক্তব্য ও জনসম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ধরন বিশ্লেষণ করলে এমনটাই মনে হয় যে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত বেশ দীর্ঘ সময়ের জন্য চলবে। যুক্তরাষ্ট্রের আগামী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতিগত অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে, কারণ ট্রাম্প ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি সোচ্চার হয়েছেন। যদিও ২০১৬ সালে তিনি যখন প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন তখন এই পদক্ষেপ নেননি। আর ন্যাটোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ৭৫ বছরের এই সম্পর্ক তিনি একার সিদ্ধান্তে ছিন্ন করতেও পারবেন না। কাজেই, পশ্চিমা দেশগুলোর এই দোটানার কারণে ইউক্রেনে যুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হবে, এমনটা বলাই যায়।

এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ভেতরে যদি সামরিক অভ্যুত্থান না হয়, অথবা পুতিন স্বাস্থ্যজনিত কারণে মারা না যান তাহলে এই যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার একমাত্র উপায় দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান। আর আপাতত কোনো পক্ষই আলোচনায় বসতে সম্মত নয়। তাই বলা যায় যে, ২০২৪ সালেও যুদ্ধ চলবে, তবে অনির্দিষ্ট কালের জন্য চলবে না।

যুদ্ধের ভবিষ্যত্ নির্ধারিত হবে অন্যত্র

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাসচিব মাইকেল ক্লার্কের মতে, এই যুদ্ধ ২০২৩ সালে গড়ানোর পর এটাও নিশ্চিত হয়েছে যে, শিল্প বিপ্লব চলাকালীন সময়কার যুদ্ধে যেমন পরিস্থিতি তৈরি হতো, এই যুদ্ধকে ঘিরে সেরকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শিল্প বিপ্লবের সময় কোনো একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক কার্যক্রম প্রভাবিত হতো যুদ্ধকে ঘিরে। অর্থাত্, যুদ্ধের সময় যে ধরনের পণ্য প্রয়োজন হয়, অর্থনীতিতে সেই ধরনের পণ্য উত্পাদনের পরিমাণ বেড়ে যায়।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে, অর্থাত্ ২০২১ সাল থেকে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা বাজেট তিন গুণ বেড়েছে। আগামী বছর রাশিয়ার সরকারি ব্যয়ের ৩০ শতাংশ খরচ হবে যুদ্ধের পেছনে। এর অর্থ, এই যুদ্ধ ইউরোপের জন্য ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপ মহাদেশ সবচেয়ে দীর্ঘ ও সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি পূর্ণ যুদ্ধে পরিণত হতে পারে এই যুদ্ধ।

তিনি বলেন, শিল্প বিপ্লবের সময়কার যুদ্ধের মতো, এই যুদ্ধও বিভিন্ন সমাজব্যবস্থার মধ্যকার প্রতিযোগিতায় রূপান্তরিত হবে। যুদ্ধক্ষেত্রে যেসব ঘটনা ঘটবে, তা আন্তঃসামাজিক প্রতিযোগিতার উপসর্গ হিসেবেই পরিলক্ষিত হবে। ২০২৪ সালে এই যুদ্ধের সামরিক পরিণতি আভদিভকা, তোকমাকের মতো সম্মুখ যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ধারিত না হয়ে নির্ধারিত হবে মস্কো, কিয়েভ, ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস, বেইজিং, তেহরান ও পিয়ংইয়ংয়ে।

যুদ্ধ বদলে দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান

ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি ইউরোপের সাবেক কমান্ডিং জেনারেল বেন হজেস মনে করেন, সক্ষমতার দিক থেকে ইউক্রেনকে সম্পূর্ণরূপে দখল করতে রাশিয়া অপারগ। ইউক্রেনের যতটুকু অঞ্চল তারা দখল করে রেখেছে, ততটুকুই তারা দখল করে রাখবে। এই সময়টা কাজে লাগিয়ে তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা বলয় আরো শক্তিশালী করবে এবং কতদিনে পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলে, তার জন্য অপেক্ষা করবে। কিন্তু ইউক্রেন থামবে না। তাদের লড়াই টিকে থাকার এবং তারা জানে যে, তারা থেমে গেলে রাশিয়া কী করবে।

আগামী গ্রীষ্মের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করতে পারবে ইউক্রেন। এই যুদ্ধবিমান ইউক্রেনের নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে যেমন শক্তিশালী করবে, তেমনি রুশ বিমানের বিপক্ষে তাদের আক্রমণকেও সুসংহত করবে। তবে যুদ্ধের শেষটা কেমন হবে সেটা এখনই বলা কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

আজকের দিন-তারিখ
  • শুক্রবার (সকাল ৮:২৩)
  • ২১শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
  • ১৫ই জিলহজ, ১৪৪৫ হিজরি
  • ৭ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল)
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Raytahost.com