ফি নিয়ে টানাটানি, সার্ভার ডাউন—‘জন্ম নিবন্ধন’ তুমি কার?

রাজধানী ঢাকার কোনো নাগরিক এই মুহূর্তে জন্ম নিবন্ধন করতে পারছেন না। দুই সিটি কর্পোরেশনের কোনোটিই নাগরিকদের এই সেবা দিচ্ছে না। দক্ষিণ সিটিতে চলছে ‘লাভের গুড় কে খাবে’ তা নিয়ে টানাটানি আর উত্তর সিটিতে সার্ভার ডাউনের অজুহাত। দুই সিটির কেউই নাগরিকদের প্রয়োজনের কথা চিন্তা করছে না।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, চাকরিতে যোগদান, পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ নাগরিক সেবার ১৯টি ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন সনদ প্রয়োজন হয়। জন্ম নিবন্ধন একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল, যা সবার আবশ্যিক প্রয়োজন। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রয়োজনীয় দলিল হাতে পেতে দিনের পর দিন সিটি কর্পোরেশনের কার্যালয়ে ঘুরে ঘুরেও কোনো ফল পাচ্ছেন না নাগরিকরা।রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার বাসিন্দা ইমদাদুল হক তার দেড় বছরের ছেলের জন্ম নিবন্ধন এখনো করেননি। সম্প্রতি পাসপোর্ট করানোর জন্য ছেলের জন্ম সনদের প্রয়োজন পড়ে। তাকে আবেদন করতে হবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অঞ্চল-২ এর আওতাধীন আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে। সে অনুযায়ী তিনি গত মাসে দুবার সেখানে যান। গিয়ে জানতে পারেন আপাতত জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ আছে। চলতি মাসে তিনি আরও একবার সেই অফিসে যান। তবে ফলাফল শূন্য।

ইমদাদুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, যতবার গেছি তারা ততবারই বলেছে, আপাতত বন্ধ আছে এ কার্যক্রম। কিন্তু ছেলের পাসপোর্ট করানোর জন্য জন্ম নিবন্ধন জরুরিভাবে প্রয়োজন। সরকারি সেবা কেন বন্ধ থাকবে, এটা আমি বুঝতে পারছি না। একজন নাগরিক হিসেবে এটা তো আমার অধিকার। সংস্থাগুলোর নিজেদের সমস্যার জন্য আমরা সাধারণ নাগরিক কেন ভুক্তভোগী হব?

জানা গেছে, প্রায় দুই মাস ধরে বন্ধ আছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের আবেদন প্রায় করাই যাচ্ছে না। সেখানে বেশিরভাগ সময় থাকছে না সার্ভার। সব মিলিয়ে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাসিন্দারা জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম নিয়ে পড়েছেন সীমাহীন ভোগান্তিতে।

জটিলতার মূলে ই-পেমেন্ট!

বিভিন্ন সূত্র বলছে, মূলত জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের ফি সিটি কর্পোরেশন পাবে নাকি সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হবে– এ নিয়ে তৈরি হয়েছে সমস্যা। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ফি পরিশোধে সম্প্রতি ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়। ফলে এই ফি সরাসরি চলে যাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। এ কারণেই বন্ধ করে রাখা হয়েছে আছে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের জন্ম নিবন্ধন সেবা।

দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, লোকবল, সনদের জন্য খরচ, প্রিন্টিং খরচ, কার্যালয়ের খরচ– সব মিলিয়ে এ খাতে তাদের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। তবু সিটি কর্পোরেশন সব কাজ করবে কিন্তু ফি তাদের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে যাবে এটি তারা মেনে নেয়নি। এ নিয়ে সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চিঠি চালাচালি চলছে। তবে এখনো সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। ফলে দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে বন্ধ আছে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম।

রাজধানীর বাসাবো এলাকার বাসিন্দা রিয়াজুল ইসলাম তার মেয়ের জন্ম নিবন্ধন সনদ নিতে পারছেন না বেশ কিছুদিন ধরে। তিনি বলেন, আমি সিটি কর্পোরেশনের কার্যালয়ে বেশ কয়েকবার গিয়েছি, তারা জানিয়েছে এ সেবা আপাতত বন্ধ আছে। সেবা কার্যক্রম চালু হলে আমাকে যেতে বলেছে। পরে অন্যদের মাধ্যমে শুনেছি জন্মনিবন্ধনের ফি আগে সিটি কর্পোরেশন পেত। এখন নতুন নিয়ম চালু হওয়ায় এ টাকা ই-পেমেন্টের মাধ্যমে সরাসরি সরকারি কোষাগারে চলে যাচ্ছে। তাই তারা সেবা বন্ধ করে রেখেছে। কিন্তু এটা তো আমাদের বিষয় নয়, তাহলে আমরা কেন বারবার ঘুরব তাদের অফিসে?

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অঞ্চল-২ এর জন্ম মৃত্যু নিবন্ধনের কাজের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দক্ষিণ সিটির আওতাধীন সব এলাকাতেই আপাতত এ কার্যক্রম বন্ধ আছে। সুনির্দিষ্ট এবং যৌক্তিক কারণে এটা বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া আছে। ই-পেমেন্ট চালুর পর সেবার ফি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়। আগে ফি দক্ষিণ সিটিতে দিতে হতো, তা সপ্তাহ শেষে চালান আকারে রাষ্ট্রীয় কোষাগারেই যেত। সেটি সিটি কর্পোরেশনের তফসিলভুক্ত আয় হিসেবে যুক্ত হতো। এখন সেটা না হয়ে সরাসরি ই-পেমেন্টের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে। তাই দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন আপাতত এ কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। এখানে সিটি কর্পোরেশনের কোনো আয় হচ্ছে না। লোকবলসহ অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে, তাহলে কেন এটি আমরা করব? মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে চিঠি চালাচালি চলছে, শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকা পোস্টকে বলেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের জন্য সরকার নির্ধারিত সেবামূল্য দেওয়া আছে। এর বাইরে আমরা কোনো অর্থ নিই না। অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে আমরা এ দায়িত্ব পালন করে আসছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, এ বিষয়ে যে অধিদপ্তর আছে তারা সরাসরি সেবার মূল্য নিয়ে যাচ্ছে, যেটা আইন-বহির্ভূত। আইনে আছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন বা অন্য প্রতিষ্ঠান ফি আদায় সাপেক্ষে সেবাটি দেবে। সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা মন্ত্রী ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি।

এদিকে জন্ম নিবন্ধন পেতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অনলাইনে ঠিকমতো আবেদন করা যাচ্ছে না। এছাড়া আগের মতো সার্ভার না থাকার সমস্যা তো রয়েছেই।

রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার বাসিন্দা রবিউল ইসলাম। তিনি মেয়ের জন্মনিবন্ধনের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আঞ্চলিক কার্যালয়ে কয়েকবার গিয়েও আবেদন করতে পারেননি।

তিনি অভিযোগ জানিয়ে বলেন, খিলক্ষেত এলাকায় আমার বাসা হওয়ার কারণে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের অঞ্চল-৯ এর মহাখালী অফিস থেকে জন্ম নিবন্ধন করাতে হবে। এ তথ্য জেনে প্রথমে সেখানে যাই। জানানো হয়, বাইরে থেকে অনলাইনে তথ্য পূরণ করে আবেদন করতে হয়। কম্পিউটার দোকানে গিয়ে সবকিছু পূরণ করে আবেদন সাবমিট করার সময় দেখি আমার আবেদন নিচ্ছে না। এভাবে বেশ কিছুদিন ঘুরেছি। পরে যখন আবেদন করা গেছে তারপর শুরু হয়েছে সার্ভার না থাকার সমস্যা। সার্ভার না থাকলে কোনো কাজই করা যায় না। যখনই সেখানে যাই, দায়িত্বরতরা বলেন সার্ভার নেই, অন্যদিন আসুন।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের এক সহকারী নিবন্ধক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সার্ভার না থাকা এটা আমাদের কোনো সমস্যা নয়, এটি নিয়ন্ত্রণ হয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে। আমরা কোনোকিছু বন্ধ করে রাখি না। সার্ভার পাওয়া যায় না মাঝে মাঝে, তখন আমরা সেবাগ্রহীতাদের ফেরত পাঠাই। সার্ভার ডাউন থাকার কারণে যদি কেউ সেবা না পায়, সেখানে আমাদের তো কিছু করার নেই।

নাগরিকরা কোথায় যাবেন?

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন এলাকায় কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করলে তার মা-বাবাকে প্রথমে ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিসের মাধ্যমে ক্লিয়ারেন্স নিতে হয়। তারপর যেতে হয় সিটি কর্পোরেশনের আঞ্চলিক কার্যালয়ে। সেখান থেকে দেওয়া হয় জন্ম নিবন্ধন সনদ। কিন্তু কোনো ভুল হলে সেটি আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে সংশোধন করা যায় না। সেক্ষেত্রে যেতে হয় সদরঘাটে অবস্থিত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে।

এছাড়া জন্ম সনদ নিতে প্রথমে অনলাইনে আবেদন করে যেতে হয় সিটি কর্পোরেশনের আঞ্চলিক কার্যালয়ে। সেখানে জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তথ্য ইনপুট দেন। পরে সেটি ভেরিফাই হয়ে আসে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে।

রেজিস্ট্রারের কার্যালয় আর সিটি কর্পোরেশনের টানাটানিতে এখন পুরো সেবাটিই বন্ধ আছে দক্ষিণ সিটিতে। আর উত্তর সিটিতে লেগেই আছে সার্ভারের সমস্যা। তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে- সে প্রশ্ন তুলেছেন নাগরিকরা।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

আজকের দিন-তারিখ
  • বৃহস্পতিবার (রাত ১০:৩২)
  • ৩০শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
  • ২২শে জিলকদ, ১৪৪৫ হিজরি
  • ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ (গ্রীষ্মকাল)
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Raytahost.com