সু চির দুঃস্বপ্নের শুরু

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনা বাহিনীর ভয়াবহ নিপীড়ন ও গণহত্যা চালানোর কথা স্বীকার করা দুই সেনা সদস্য নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে পৌঁছানোর খবর ফাঁস হওয়ার ঘটনায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ।

উদ্ভুদ এই পরিস্থিতিকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, সরকার এবং বিশেষ করে স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির জন্য দুঃস্বপ্নের শুরু হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

মিয়ো উইন তুন (৩৩) ও য নিং তুন (৩০) নামের ওই দুই সেনা মিয়ানমার বাহিনীর পক্ষ ত্যাগ করে রাখাইন রাজ্যে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সশস্ত্র সংগ্রামরত আরাকান আর্মির কাছে আত্মসমর্পণ করে এই স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতি দেন। সম্প্রতি তারা দ্য হেগে পৌঁছেছেন।

নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত (আইসিজে) অবস্থিত। আইসিজেতে জেনোসাইডবিরোধী সনদ লঙ্ঘন ও রোহিঙ্গা জেনোসাইড সংঘটনের দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার মামলা চলছে। অন্যদিকে আইসিসির নির্দেশে এর প্রসিকিউটরের দফতর রোহিঙ্গা গণহত্যা, গণবাস্তুচ্যুতিসহ গুরুতর অপরাধের অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

জানা গেছে, মিয়ানমারের ওই দুই সেনা দুটি আদালতেরই নাগালের মধ্যে আছেন। আগামী দিনগুলোতে তাদের সম্ভাব্য সাক্ষ্য, স্বীকারোক্তি ও তথ্য-উপাত্ত রোহিঙ্গা জেনোসাইডের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ‘টার্নিংপয়েন্ট’ হয়ে উঠতে পারে।

এদিকে রোহিঙ্গা জেনোসাইডসহ নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করে আসা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান কতটা সফলভাবে চালানো যাবে তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ছিল। কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দুই সদস্যের স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতি পুরো পরিস্থিতিকে বদলে দিতে পারে।

নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চল বিষয়ক সাবেক উপপরিচালক ফেলিম কাইন টুইট বার্তায় বলেছেন, রোহিঙ্গা গণহত্যার সাক্ষী হিসেবে মিয়ানমারের সামরিক কর্মকর্তাদের আইসিসিতে উপস্থিতি অং সান সু চির জন্য চরম দুঃস্বপ্ন। কারণ তার সরকার আইসিসির বিষয়ে অস্বীকার, অগ্রাহ্য করার নীতি অনুসরণ করে আসছে।

মানবাধিকার সংগঠন ফরটিফাই রাইটসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যাথু স্মিথ বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতা চালানোর বিষয়ে প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের দুই সেনার স্বীকারোক্তি ওই দেশটির সামরিক বাহিনীর দায়মুক্তি বর্মে বড় ধরনের ফাটল ধরাবে। টুইট বার্তায় তিনি আরো বলেন, ন্যায়বিচারের জন্য রোহিঙ্গা ও মিয়ানমারের জনগণের জন্য এটি এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

ম্যাথু স্মিথ বলেছেন, মিয়ানমারের ওই দুই সেনার কাছ থেকে জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়নি, এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই ফরটিফাই রাইটস এ বিষয়ে বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। তিনি বলেন, ‘যদি মনে হতো যে জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে তবে ঝোঁকের বশে বাংলাদেশ আইসিসির সঙ্গে যোগাযোগ করবে না কিংবা আইসিসিও কাউকে দ্য হেগে নিয়ে যাবে না। এভাবে ওই আদালত (আইসিসি) চলে না।’

এদিকে মিয়ানমারবিষয়ক কানাডার সাবেক বিশেষ দূত ও বর্তমানে জাতিসংঘে কানাডার রাষ্ট্রদূত বব রে বলেছেন, রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চালানোর বিষয়ে মিয়ানমারের দুই সেনার স্বীকারোক্তি দেশটির সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে নৃশংসতার আন্তর্জাতিক ফৌজদারি তদন্তে বড় প্রভাব ফেলবে।

কানাডা এ ব্যাপারে পরবর্তী উদ্যোগ নিতে সহায়তা করবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বব রে বলেছেন, যদিও ওই ব্যক্তি গুরুতর ফলাফলের মুখোমুখি হতে পারেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তারা তাদের অপরাধমূলক কাজের মাত্রা সম্পর্কে অবগত এবং তারা এককভাবে ওই অপরাধ করেননি।

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর নৃশংসতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সহযোগীর ভূমিকার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন লন্ডনে অবস্থানরত মিয়ানমারের নির্বাসিত মানবাধিকারকর্মী মং জার্নি।

ওই আরাকান আর্মিই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ওই দুই সদস্যকে আটক করেছিল। তাদের কাছেই প্রথম রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালানোর বর্ণনা দিয়েছেন। আরাকান আর্মির মুখপাত্র খাইন থু খা বলেছেন, ‘ওই দুই সেনা মিয়ানমার বাহিনী থেকে পালিয়েছেন। আমরা তাঁদের অভিজ্ঞতার বিষয়ে সাক্ষাত্কার নিয়েছি।’

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Raytahost Facebook Sharing Powered By : Raytahost.com