মাদক বা মদ গ্রহণ ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। এতে মানুষের চরিত্রিক অবক্ষয় ঘটে। এবং দুনিয়া ও আখিরাতকে ধ্বংস করে দেয় মাদক। প্রিয় নবী বলেন, মদ পান কর না, কারণ তা সব অনাচারের চাবিকাঠি। (ইবনে মাজা)

ইসলাম পূর্ব যুগে এমনকি ইসলামের শুরুর দিনগুলোতেও মদ পানের প্রচলন ছিলো। আল্লাহ তায়ালা মোট চারটি ধাপে মদ হারাম করেন।

প্রথম পর্যায়

আল্লাহ তায়ালা কোরআনের আয়াত নাজিলের মাধ্যমে ঘোষণা দিলেন যে, তোমরা খেজুর ও আঙ্গুর দ্বারা মাদক তৈরির পাশাপাশি উত্তম খাদ্য বস্তুও তৈরি করে থাক। যেমন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে

‘আর খেজুর গাছের ফল ও আঙ্গুর হতে তোমরা মাদক ও উত্তম খাদ্য গ্রহণ করে থাক।’ (সূরা নাহল, আয়াত: ৬৭)

এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সরাসরি মাদক হারাম করেননি, তবে জানিয়ে দিলেন, মাদক ভিন্ন জিনিস। আর উত্তম খাদ্যবস্তু ভিন্ন জিনিস। এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর সাহাবায়ে কেরাম ধারণা করে নিলেন যে, মাদক সম্পর্কে কোনো বিধান আল্লাহ তায়ালা অচিরেই নাজিল করবেন।

দ্বিতীয় পর্যায়

এরপর সাহাবায়ে কেরাম যখন মাদক সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেন তখন আল্লাহ তায়ালা কোরআনের আয়াত নাজিলের মাধ্যমে তার প্রিয় হাবীবকে জানিয়ে দিলেন যে, মদের মাঝে উপকার ক্ষতি উভয়ই রয়েছে। তবে উপকারের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণটা বেশি। কোরআনে এসেছে,

يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِنْ نَفْعِهِمَا

‘তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বল, এ দু’টোয় রয়েছে বড় পাপ ও মানুষের জন্য উপকার। আর তার পাপ তার উপকারিতার চেয়ে অধিক বড়।’ (সূরা বাকারা, আয়াত: ২১৯)

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা সাহাবায়ে কেরামের অন্তরে মাদকের প্রতি কিছুটা ঘৃণার সৃষ্টি করে দিলেন। ফলে সাহাবায়ে কেরাম দু’দলে ভাগ হয়ে গেলেন। একদল ক্ষতির দিক বিবেচনায় তা বর্জন করলেন। আরেকদল চিন্তা করলেন, যেহেতু কিছুটা উপকার রয়েছে তাই তা গ্রহণে কোনো সমস্যা হবে না।

তৃতীয় পর্যায়

এ পর্যায়ে আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাজিল করে জানিয়ে দিলেন, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছেও যাওয়া যাবে না। যেমনটি ইরশাদ হয়েছে,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنْتُمْ سُكَارَى

‘হে মুমিনগণ, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তোমরা নামাজের নিকটবর্তী হয়ো না।’ (সূরা নিসা, আয়াত: ৪৩)

চতুর্থ পর্যায়

এই আয়াতে সবসময়ের জন্য মদকে পরিষ্কার হারাম ঘোষণা না করায় অনেকেই নামাজের সময় বাদে অন্য সময় মদ গ্রহণ করতেন। ইতিমধ্যে ঘটে যায় আরও একটি ঘটনা। আতবান ইবনে মালেক (রা.) কয়েক সাহাবিকে দাওয়াত করেন। যাদের মধ্যে অন্যতম একজন অতিথি ছিলেন সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.)। খাবার শেষে মদপানের প্রতিযোগিতা আরম্ভ হয়। সেখানে আরবের প্রথা অনুপাতে কবিতা পাঠ ও নিজ নিজ বংশের গৌরবগাথা বর্ণনা শুরু হলে একজন মুহাজির সাহাবি আনসারদের দোষারোপ করে নিজেদের প্রশংসাকীর্তন করে আবৃত্তি করলেন একটি কবিতা। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আনসারি এক যুবক উটের গলার একটি হাড় ছুড়ে মারেন তার মাথায়।

মারাত্মকভাবে আহত হয়ে রাসুলের কাছে ছুটে যান তিনি। অভিযোগ করেন সেই যুবকের বিরুদ্ধে। তখন রাসুল (সা.) দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ! মদ সম্পর্কে আমাদেরকে একটি পরিষ্কার বর্ণনা ও বিধান দান করুন, যাতে সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিরসন হয়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা মদ-জুয়াকে সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করলেন।’ ‘হে ঈমানদাররা! মদ, জুয়া, মূর্তি ও তীর নিক্ষেপ এসব নিকৃষ্ট বস্তু ও শয়তানের কাজ। কাজেই তোমরা এগুলোকে বর্জন করো। যাতে তোমরা সফল হতে পারো।

শয়তান মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা ও তিক্ততা ঘটাতে চায় এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখতে চায়। তবুও কি তোমরা তা থেকে বিরত থাকবে না!’ (সুরা মায়েদা : ৯০-৯১)। এই আয়াতে মদ ও জুয়াকে নিকৃষ্ট বস্তু ও ক্ষতিকর কাজ উল্লেখ করে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘যখন নবীজির পক্ষ থেকে একজন ঘোষক মদিনার অলিগলিতে প্রচার করতে লাগলেন যে, মদপান হারাম ঘোষণা করা হয়েছে, তখন যার হাতে মদের যে পাত্র ছিল, তা তারা সেখানেই ফেলে দিয়েছিলেন। সেদিন মদিনায় এত পরিমাণ মদ নিক্ষিপ্ত হয়েছিল যে, মদিনার অলিগলিতে বৃষ্টির ফলে সৃষ্ট কাদাপানির মতো অবস্থা হয়েছিল এবং অনেক দিন পর্যন্ত মদিনার অলিগলির অবস্থা এমন ছিল, যখনই বৃষ্টি হতো, মদের গন্ধ মাটির ওপর ফুটে উঠত।’ (তাফসিরে মায়ারেফুল কোরআন : ১/৫২৫)

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

আজকের দিন-তারিখ
  • বুধবার (রাত ১:৪৬)
  • ১৭ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
  • ৮ই শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি
  • ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ (গ্রীষ্মকাল)
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Raytahost.com